ফিকহ

by মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ আব্দুল মালেক


2015-08-30 23:46:24


পরিবর্তিত বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ফিকহে হানাফীর অবদান

ইসলামী শরীয়তের প্রধান দুটি উৎসের একটি হলো কুরআন অপরটি হলো সুন্নাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকেই কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে দুটি অনুসৃত পন্থা চলে আসছে। এক. সরাসরি বিধান আহরণ। দু্ই. বিধান আহরণে কারো অনুসরন। যিনি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান আহরণ করতে সক্ষম তিনি নিজে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান আহরণ করে চলবে। আর যিনি এ সক্ষমতা রাখেন না তিনি প্রথমোক্ত ব্যক্তির সহযোগিতায় কুরআন-সুন্নাহর উপর আমল করবেন।

প্রথম ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহ থেকে শরীয়তের যে বিধি-বিধান চেষ্টা-গবেষণা করে বুঝেছেন তার এ বুঝকে কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় ‘ফিক্হ’ বলে। ফিকহ কুরআন-সুন্নাহর বাইরের কিছু নয়। তাই তার এই বুঝকে কখনো উৎস তথা কুরআন-সুন্নাহর সাথে সম্বন্ধ করে বলা হয় ‘ফিকহুল কিতাবি ওয়াস্ সুন্নাহ’। আবার কখনো ফিকহ আহরণকারীর সাথে সম্বন্ধ করে বলা হয় ‘ফিকহু ফুলান’-অমুক ব্যক্তি বা অমুক নগরীর আলেমদের ফিকহ।

ফিকহের ক্ষেত্রে যেহেতু উসূল ও সুন্নতে রাসূল-এ একক সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই, তাই সাহাবায়ে কেরামের ফিকহের মাঝে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষেত্রে দুই শহরের ফিক্্হের মাঝে যেমন ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে একই শহরের দুইজন ফকীহ সাহাবীর ফিক্্হের মাঝেও সৃষ্টি হয়েছে ভিন্নতা। ইজতেহাদগত এই মতপার্থক্য হাদীসের দৃষ্টিতে উম্মতের জন্য প্রশস্ততা ও রহমতস্বরূপ। আর এক ও অভিন্ন মাযহাবের চিন্তা করা সংকীর্ণতা। সাহাবায়ে কেরামদের রা. ফিকহী মতাদর্শ এক না হওয়ায় তাদের ফিকহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও শহরের দিকে সম্পৃক্ত হয়ে পরিচিতি লাভ করেছে। যথা-ফিকহে ইবনে আব্বাস, ফিকহে ইবনে ওমর, ফিকহে আমর ইবনুল আস, ফিকহে আয়শা, ফিকহে আহলে মাদীনা ও ফিকহে আহলে কূফা।

পরবর্তীতে তাবিয়ীগণ তাঁদের ফিকহ সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন। আর যেসব বিষয়ে তাদের কোনো মতামত নেই তাতে নতুন করে ইজতেহাদ করেছেন। এই ক্ষেত্রে চার ইমাম যেহেতু বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, তাই ফিকহী মাসলাক সাহাবীদের নামে প্রসিদ্ধ না হয়ে চার ইমামের নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। অবশ্য চার ইমাম ছাড়া আরো বহু মুজতাহিদ ইমাম ফিকহ সংকলনের কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁদের সংকলন যথাযথ  সংরক্ষিত না হওয়ায় তাঁদের মাযহাব প্রসিদ্ধি লাভ করেনি।

অতএব ফিক্্হে হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী সবই ফিকহে সালাফ। এ সকল ফিকহে যেসব বিষয়ে এক ও অভিন্ন মত রয়েছে, তা মূলত সালাফের ফিকহেও সর্বসম্মত ছিল। পক্ষান্তরে যেসব বিষয়ে মতোবিরোধ হয়েছে তা সেখানেও বিরোধপূর্ণ ছিল।

আধুনিক বিশ্বে আইন-কানুন প্রণয়নের পূর্বে নীতিমালা তৈরি করা হয়, আর নীতি মালা তৈরি হয় সংবিধানের আলোকে। তাই কোনো আইন সংবিধান পরিপন্থী হওয়ার সুযোগ নেই।

একইভাবে ইসলামী ফিকহের জন্যও রয়েছে নীতিমালা তথা উসূলুল ফিকহ। আর ফিকহ ও উসূলুল ফিকহ উভয়ের মূল উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। মোটকথা ফিকহ মূলত কুরআন-সুন্নাহরই বিধিবদ্ধ রূপ। কুরআন-সুন্নাহর বাইরের কিছু নয়।

ইসলামী ফিক্হের মৌলিক কয়েকটি বৈশিষ্ট্য

এক. ইসলামী ফিক্্হ মানব জাতির সমস্যাবলির নির্ভুল ও বাস্তবোচিত সমাধান। কারণ, এটি মানব চরিত্র সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রণীত বিধি-বিধানেরই বিধিবদ্ধ রূপ। পক্ষন্তরে মানুষের জ্ঞান সীমিত। উপরন্তু তারা আবেগ-অনুভূতি ও পরিবেশ-পরিস্থিতি দিয়ে প্রভাবিত থাকায় তাদের রচিত আইন-কানুন যেমন নির্ভুল ও বাস্তবোচিত হতে সক্ষম হয় না, তেমনি ইনসাফ ও ভারসাম্যপূর্ণও হয় না।

দুই. ইসলামী ফিক্হ পর্যাপ্ত। মানব জীবনের সকল বিষয়ের সমাধান এতে রয়েছে। পক্ষান্তরে মানব রচিত আইন অপর্যাপ্ত ও অপ্রতুল। সমসাময়িক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কিছু শৃংখলার বিষয়ই তাতে স্থান পায়।

তিন. ইসলামী ফিক্্হ সর্বকালের জন্য উপযোগী। কোথাও এর গতি রুদ্ধ হয় না। এতে যেমন রয়েছে চলমান বিশ্ব সমস্যার সমাধান, তেমনি রয়েছে অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্মের সমস্যাবলির যথাযথ সমাধান। এর নীতিমালা ও উৎসে এমন ব্যাপকতা রয়েছে যে, কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর যে কোনো সমস্যার সমাধান এর আলোকে দেয়া সম্ভব।

আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ফিক্হে হানাফীর সক্ষমতা

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমান বিশ্ব খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। বিগত এক’শ বছরে বিশ্ব ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন হয়নি, বর্তমান কয়েক দশকে তার চেয়ে বহু গুণে পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের জীবন-মান, আচার-অভ্যাস, কৃষ্টি-কালচার, পরিবেশ-পরিস্থিতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সেবাসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে এক মহা পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে নিত্য নতুন বিষয় সামনে আসছে। অথচ অতীতে তার কল্পনাও ছিল না। তাই প্রশ্ন ওঠছে তের’শ বছর পূর্বের সংকলিত ফিক্্হ ও জীবন বিধান দ্বারা আধুনিক বিশ্বের সমস্যাবলির সমাধান কিভাবে সম্ভব? বক্ষমান প্রবন্ধে বাস্তবতার নিরিখে এ প্রশ্নেরই জবাব তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে ।

এর উত্তর হলো, ইসলামি আইনে কিছু বিষয় আছে অকাট্য, চিরন্তন ও সর্বসম্মত তা সকল যুগে অপরিবর্তিত থাকে। আর কিছু বিষয় আছে যুগের সাথে সম্পৃক্ত। ফিক্্হে হানাফী তের’শ বছরের পূর্বের বিধিবদ্ধ আইন হলেও এর দ্বিতীয় শ্রেণীর মাসায়েলের ক্ষেত্রে যুগে যুগে গবেষণা হয়েছে।

তাছাড়া এ ফিক্্হে রয়েছে প্রচুর মাসায়েল। সমকালীন বিষয় ছাড়াও অনাগত বহু বিষয়ের সমাধান এতে রয়েছে। বিভিন্ন শাসনামলে ফিক্হে হানাফী অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ায় এতে জনজীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়ের বাস্তবভিত্তিক সমাধান স্থান পেয়েছে। এছাড়া এই ফিক্্হের ব্যাপকতা আধুনিক সমস্যার সমাধানে এক বিশাল নিয়ামক। বহু বিষয়ে একাধিক মত সংকলিত হয়েছে। অনেক মাসআলাতে প্রয়োজন, প্রচলন, ইল্লতের অবিদ্যমান ও যুগের পরিবর্তন ও অবৈধ সুযোগ গ্রহণের পথ বন্ধের উদ্দেশ্যে বিধান পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি জনগণের চরম দুর্ভোগের বিবেচনায় বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতের ভিত্তিতে ভিন্ন ফিক্্হ বা মাযহাব অনুযায়ী ফতওয়া দেয়ারও সুযোগ রয়েছে। ফলে এই ফিক্্হের মাধ্যমে সকল যুগের সমস্যা সমাধান সম্ভব। এটি সর্বকালে সমান গতিতে চলার সক্ষমতা রাখে। কোনো যুগে এর গতি মন্থর বা স্থবির হওয়ার সুযোগ নেই।

বিষয়টি পরিস্কারভাবে বুঝার জন্য উল্লিখিত দিকগুলো নিন্মে কিছুটা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃ

প্রথম বিষয়ঃ ফিকহে হানাফীতে রয়েছে মাসায়েলের বিশাল ভাণ্ডার। এতে যে পরিমাণ মাসায়েল রয়েছে অন্য কোনো ফিক্্হে তা নেই।

ইমাম যাহেদ হাসান কাউসারী রহ. বলেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. প্রণীত মাসায়েল সংখ্যা কম করে হলেও তিরাশি হাজার হবে। -ফিকহু আহলিল ইরাক পৃঃ ১৬৭

আবুল ফজল কিরমানী রহ. আরো বেশি সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আবু হানীফা রহ. এর মাসায়েলের সংখ্যা পাঁচ লক্ষ হবে।

আকমালুদ্দীন বাবরতী রহ. ‘ইনায়া’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, কেউ কেউ বলেছেন, হানাফী মাযহাবের মাসআলার সংখ্যা ১২ লক্ষ সত্তর হাজারেরও বেশি। (ইনায়া শরহুল হেদায়া ১/৬)

স্মর্তব্য, এসব মাসায়েলের মধ্যে কেবল ফিক্্হ সংকলনের যুগের সমস্যার সমাধানই আসেনি বরং অনাগত বহু বিষয়ের সমাধান তাতে রয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয়ঃ বাস্তবিক প্রয়োগ। হানাফী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো যুগে যুগে বহু শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা ফিকহে হানাফী অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। এ সুবাদে তা বাস্তবিক প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। ফলে জন জীবনের হাজারো বাস্তবিক বিষয় এ ফিকহে স্থান পেয়েছে এবং সমস্যাবলির বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব হয়েছে।

খলীফা হারুনুর রশীদের শাসনামলে ইমাম আবু ইউসূফ রহ. ‘কাজিউল কুজাত’ তথা প্রধান বিচারপ্রতি নিযুক্ত হন। এ সুবাধে সমগ্রঅঞ্চলে তার হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত হানাফী কাজীগণই বিচারপ্রতির আসন অলংকৃত করেন। সুতরাং আব্বাসীয় খেলাফতের দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শত বছর হানাফী কাজীগণ কর্তৃক ফিকহে হানাফী অনুযায়ী বিচার ব্যাবস্থা পরিচালিত হয়।

এছাড়া গযনভী, সালজাকী, খাওয়ারযামী এবং জংকীসহ বহু শাসনামলে বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে ফিক্হে হানাফী অনুযায়ী।

সর্বশেষ সুদীর্ঘ ওসমানী খেলাফত কালে ফিক্হে হানাফী রাষ্টীয় আইনের মর্যাদা লাভ করে। (দ্রঃ আলফাতহুর রাব্বানী পৃঃ ২০১)

এই সুবাদে এই মাযহাব বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি লাভের পাশাপাশি বাস্তবিক প্রয়োগেরও সুযোগ পায়। যা এই মাযহাবকে একটি বাস্তবভিত্তিক মাযহাবে পরিণত করে। তাই তাতে বাস্তব জীবনের সমস্যারবলির সমাধান পাওয়া সহজ।

তৃতীয় বিষয়ঃ এটি একটি ‘শুরা’ভিত্তিক মাযহাব। এ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমামে আজম আবু হানীফা রহ. হলেও এতে এককভাবে তাঁর মত সংকলিত হয়নি। বরং কুরআন-সুন্নাহ থেকে মাসায়েল ইস্তেম্বাত করার জন্য তিনি একটি পরিষদ গঠন করেন। যার সদস্য ছিলেন কুরআন, হাদীস, আরবী ভাষা ও সাহিত্য এবং কিয়াস ও যুক্তি সহ সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ইমামগণ। তাদের সংখ্যা চল্লিশ জনে পর্যন্ত উন্নীত হত।

ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ফিক্হ সংকলনের পদ্ধতি :

সেই পরিষদে ইমাম আজম রহ. একটি মাসআলা পেশ করে তার হুকুম কি হবে, এর সম্ভাব্য সকল দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। একটি দিক উল্লেখ করে তার স্বপক্ষে সকল দলীল উপস্থিত করতেন। এরপর পরিষদের সদস্যদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন এর বিপক্ষে কারো কাছে কোনো দলিল আছে কি না? যখন দেখতেন সকলে তার মত মেনে নিয়েছে তখন এই মাসআলায় দ্বিতীয় একটি মত উল্লেখ করে সেটাকে পুনরায় দলীল সমৃদ্য করতেন এবং  পূবের্র সকল দলিল খণ্ডন করতেন। যখন দেখতেন এ মতের বিপক্ষেও তাদের নিকট কোনো দলিল নেই এবং সকলে এ মত মেনে নিয়েছে তখন তৃতীয় একটি মত উল্লেখ করে একই পদ্ধতি অবল্বন করতেন। সর্বশেষ তিনি চূড়ান্ত একটি মত উল্লেখ করতেন এবং পূর্বের সকল সম্ভাবনা খণ্ডন করে এই মতটিকে দলিল সমৃদ্য ও যুক্তিযুক্ত করতেন। সকলে তাতে একমত হলে তা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তরূপে লিপিবদ্ধ করা হত। পক্ষান্তরে কেউ পূর্বের কোনো সম্ভাবনার উপর থেকে গেলে তার মত ভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করা হত। (দ্রঃ মুহিতুল বুরহানীর ভূমিকা ১/২৩)

এর দ্বারা দু’টি বিষয় প্রতীয়মান হয়। যথা- এক. ফিক্হে হানাফী একক কোনো ব্যক্তির মত নয়। বরং এটি সুদক্ষ মুজতাহিদগণের এক বিশাল দলের সম্মিলিত মত। দুই. এ মাযহাবে অনেক বিষয়ে একাধিক মত সংকলিত হয়েছে। ফলে ফিক্হে হানাফীতে ব্যাপকতা সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণভাবে এ সকল মত থেকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মতের উপর আমল করা আবশ্যক হলেও কঠিন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম নির্ভরযোগ্য মতের উপর আমল করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

যেমন, হানাফী মাযহাবের ফতওয়াযোগ্য মত হলো, ক্ষতস্থানের ফোসকার চামড়া সরানো দ্বারা যদি রক্ত প্রকাশিত হয় তবে তা গড়িয়ে না পরা পর্যন্ত অযু ভঙ্গ হবে না, যদিও রক্ত ক্ষতস্থানের মাথায় ফুলে থাকে। এ অবস্থায় কেউ যদি নেকড়া দিয়ে এই রক্ত মুছতে থাকে তাহলে মাসআলা হলো, যদি সব মিলিয়ে গড়িয়ে পরার মতো হয় তাহলে অযু ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু ‘হেদায়া’ গ্রন্থাগার এখানে একটি দুর্বল মত উল্লেখ করেছেন যে, এই ক্ষেত্রে অযু ভঙ্গ হবে না। আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহ. লিখেছেন, মা’যুর ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনের সময় এ মতের উপর আমল করার সুযোগ রয়েছে। (শরহু উকুদু রসমিল মুফতী পৃঃ ৯২)

চতুর্থ বিষয়ঃ যুগের পরিবর্তনের কারণে বিধানে পরিবর্তন হওয়া। এটি ফিক্হে হানাফীর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। তবে এটা সকল বিধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং শর্ত সাপেক্ষে কিছু কিছু বিধানের ক্ষেত্রে এ সুযোগ রয়েছে। এটাকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

ক. ইল্লতের উপর নির্ভরশীল বিধান। এ ধরনের বিধান যুগের পরিবর্তনের ফলে সেই ইল্লত  অবিদ্যমানের কারণে আর বলবৎ থাকে না।

যেমন, ফুকাহায়ে কেরাম জমি সেচের জন্য পানি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। এটা এ জন্য নয় যে, পানি মাল নয়। বরং এর ইল্লত হলো এই ক্ষেত্রে পানির পরিমাণ জানা না থাকা। (ইনায়া, ফাতহুল কাদীরের সহিত মুদ্রিত ৬/৬৪)

কিন্তু বর্তমান সময়ে পানি ইত্যাদির পরিমাপের জন্য মিটার তৈরি হয়েছে। অতএব এ ধরনের যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ নিরুপন করা হলে তখন তা আর নাজায়েয হবে না।

খ.    প্রচলন পরিবর্তনের ফলে বিধানে পরিবর্তন আসা। কখনো বিধানের ইল্লত মানুষের প্রচলনের উপর নির্ভরশীল হয়। সেই ক্ষেত্রে প্রচলন পরিবর্তনের কারণে বিধানেও পরিবর্তন আসে।

যেমন, হাদীস শরীফে আছে, কেউ গবাদি পশুর পালের নিকট গেলে, দুধ খাওয়ার প্রয়োজন থাকলে মালিকের অনুমতি নিয়ে দুধ দহন করে খাবে। মালিক না থাকলে তিন বার আওয়াজ দিবে, তাতেও মালিক না আসলে বিনা অনুমতিতেই দুধ খেতে পারবে। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারবে না। (আবু দাউদ, হাদীস নং ২৬১৯; তিরমিযী হাদীস নং ১২৯৬)

ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, এটা সে যুগের প্রচলন হিসাবে বলা হয়েছে। সে সময় মানুষ পথচারীদের জন্য এ রকম সুযোগ দিতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রচলন না থাকায় অনুমতি ছাড়া কারো গবাদি পশুর দুধ দহন করা যাবে না।

গ.    জরূরত-হাজত তথা প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিধানের পরিবর্তন। তবে এর জন্য শর্ত হলো, বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত এবং অকাট্য বিধান না হতে হবে।

যেমন, নারীদের চেহারা প্রকাশ করা। মূল বিধান হিসাবে নারীদের চেহারা উম্মুক্ত করা নিষিদ্ধ। তবে সেই বিধানটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নয়। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে  ইখতেলাফ রয়েছে। কেউ কেউ এর অনুমতিও দিয়েছেন। অবশ্য নিষিদ্ধ হওয়ার মতটিই অধিক নির্ভরযোগ্য। তথাপি যারা নিষেধ করেন তারাও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে চেহারা উম্মুক্ত করার অনুমতি দেন। যথা- স্বাক্ষ্য প্রদান কালে, কিংবা হজ্জ আদায়ের সময় প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে রাস্তায় চলাচলে অসুবিধা হলে চেহারা উম্মুক্ত রাখতে পারবে।

ঘ.    বিধান পরিবর্তনের চতুর্থ কারণ হলো, অবৈধ সুযোগ গ্রহণের পথ রুদ্ধ করা। অনেক বিষয় জায়েয ও মুবাহ হওয়া সত্ত্বেও নিষিদ্ধ বস্তুর কারণ হওয়াতে তা থেকে বারণ করা হয়। এই অবৈধ সুযোগ গ্রহণের প্রবণতা কোনো যুগে বেশি থাকে, আবার কোনো যুগে কম থাকে। সেই হিসাবে জামানার পরিবর্তনের ফলে বিধানের পরিবর্তন হয়।

যেমন, মহিলাদের জন্য জামাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবদ্দশায় নারীদেরকে মসজিদে গমনের অনুমতি দিয়েছিলেন। হযরত ওমর রা. যখন দেখলেন, নারীদের মসজিদে গমন ফেতনার কারণ হচ্ছে, তখন তিনি তাঁর শাসনামলে নারীদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করেন।  হযরত আয়শা রা.ও বলেছেন, (বর্তমানে) নারীদের যে অবস্থা হয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখলে অবশ্যই তাদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করতেন, যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদেরকে বারণ করা হয়েছে। -সুনানে আবু দাউদ, ১/৮৪

পঞ্চম বিষয়ঃ ভিন্ন ফিক্হ বা ভিন্ন মাযহাব অনুযায়ী ফতওয়া প্রদান। একজন মুকাল্লিদ মুফতির জন্য যদিও নিজ মাযহাবের নিভর্রযোগ্য মতের উপর ফতওয়া দেয়া আবশ্যক। কিন্তু মনে রাখতে হবে সকল ফিক্হ ও মাযহাবই শরীয়তের তাফসীর ও ব্যাখ্যা। তা নিয়ে আপত্তি তোলার  কোনো অবকাশ নেই। ওলামায়ে কেরাম নির্দিষ্ট একটি মাযহাব আঁকড়িয়ে ধরা আবশ্যক বলেছেন ভিন্ন কারণে। মানুষ যাতে প্রবৃত্তির পিছনে ছুটে বিভিন্ন মাযহাব থেকে সুবিধাজনক বিধান বেছে না নেয়। তাদের মাঝে শরয়ী বিধানের শৃংখলা বজায় থাকে। এ জন্যই একজন দক্ষ মুফতির জন্য কঠিন প্রয়োজনের সময় বা দলিলের দৃঢ়তার কারণে ভিন্ন মাযহাব অনুযায়ীও ফতওয়া দেয়ার সুযোগ রয়েছে। শর্ত হলো তা খেয়ালীপনা এবং প্রবৃত্তি প্রবণতা থেকে না হতে হবে।

যেমন, কেউ একজনের কাছে কিছু টাকা পায়। কিন্তু ঋণগ্রহীতা তা পরিশোধ করবে বলে কোনো সম্ভাবনা নেই। এই ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাব বলে, পাওনাদার যদি কোনোভাবে ঋণগ্রহীতার টাকা-পয়সা হস্তগত করতে পারে তাহলে সে তা ঋণের পরিবর্তে নিয়ে নিতে পারবে।  তবে টাকা ছাড়া অন্য জিনিস হস্তগত হলে তা ঋণের টাকার পরিবর্তে নেওয়া যাবে না। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যে কোনো জিনিস হস্তগত হলেই তা ঋণের টাকার পরিবর্তে নিয়ে নিতে পারবে। বর্তমান সময়ে মানুষের মাঝে আত্মসাৎ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এই ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মত অনুযায়ী ফতওয়া দেয়া হয়। (রদ্দুল মুহতার ৬/১৫১ এইচ এম সাঈদ কম্পানী)।

একইভাবে নিরুদ্দেশ ব্যক্তির স্ত্রীর ব্যাপারে হানাফী মাযহাবের বিধান হলো, স্বামীর সমবয়স্ক লোকদের ইন্তেকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এরপর চাইলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এটা মহিলাদের জন্য কঠিন দুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. তৎকালীন বিজ্ঞ আলেমদের সাথে পরামর্শ করে মালেকী মাযহাব অনুযায়ী ফতওয়া দিয়েছেন। চার বছর বা একান্ত অপারগতা:বশত এক বছর অপেক্ষা করে আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করে অন্যত্র বিবাহ বসতে পারবে।

এভাবে অনেক বিষয়েই হানাফী বিজ্ঞ আলেমগণ মানুষের সমস্যা ও দুর্ভোগের প্রতি লক্ষ্য করে এবং যুগের পরিবর্তনের কারণে অন্য মাযহাবের মতের উপর ফতওয়া দিয়েছেন। এ সকল ফতওয়া হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচিত। এভাবে ভিন্ন মাযহাব অনুযায়ী ফতওয়া প্রদানের মাধ্যমেও অনেক ক্ষেত্রে ফিক্হে হানাফীতে পরিবর্তিত বিশ্বের সমস্যার সমাধান করা যায়। 

 

পরিশেষে বলা যায়, ফিক্হে হানাফী কিয়ামত পর্যন্ত সকল কাল ও যুগের জন্য চলনসই ও সামঞ্জস্যশীল।  কোনো কালেই তা দ্বীনি দাবি ও চাহিদা পূরণে এবং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেমন ব্যর্থ ও অক্ষম হয়নি, তেমনি এর গতি স্থবির বা মন্থর হয়নি বা হতে পারে না। ফিক্হে হানাফী পরিবর্তিত বিশ্বের যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম। আধুনিক বিশ্বের সমস্যার সমাধানে ফিক্হে হানাফীর বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা এ ফিক্হকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে কাজে লাগান। আমিন।


Leave a Comment:


No Comment.

Blog Search

প্রবন্ধ-নিবন্ধ


সকল প্রশ্ন উত্তর